আমাদের শরীরের পেটের একেবারে নিচের অংশে একটি জালের মতো বিছানো পেশি রয়েছে, যাকে আমরা তলদেশীয় পেশি বলে থাকি। এই পেশির গঠন এবং এটি আমাদের শরীরে কী কী গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে, তা সুস্থ জীবনের জন্য আমাদের সবারই খুব সহজভাবে জানা প্রয়োজন।
পেশির গঠন ও অবস্থান
আমাদের পেটের নিচের দিকের এই তলদেশীয় পেশিগুলো অসংখ্য ছোট ছোট পেশির তন্তু এবং একে অপরের সাথে যুক্ত থাকা নানা ধরনের কোষকলা দিয়ে তৈরি একটি জটিল আবরণ। এটি দেখতে অনেকটা ঝোলা বিছানা বা দোলনার মতো। এটি আমাদের তলপেটের একেবারে সামনের দিকের হাড় থেকে শুরু করে পেছনের দিকে মেরুদণ্ডের একদম শেষ প্রান্তের হাড় বা লেজ-হাড় পর্যন্ত খুব সুন্দরভাবে বিস্তৃত থাকে।
আমাদের শরীরকে যদি একটি কৌটা বা বাক্সের মতো কল্পনা করি, তবে সেই বাক্সের একদম নিচের তলাটি তৈরি করে এই তলদেশীয় পেশি। এই বাক্সের একেবারে উপরের অংশে থাকে আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার প্রধান পেশি বা মধ্যচ্ছদা, আর চারপাশ ঘিরে থাকে পেট এবং পিঠের শক্তিশালী পেশিগুলো। এই পুরো ব্যবস্থাটি একসাথে মিলে আমাদের শরীরকে সোজা রাখতে এবং শরীরের কাঠামোকে সঠিকভাবে কাজ করতে সাহায্য করে।
তলদেশীয় পেশির প্রধান কাজসমূহ
আমাদের দৈনন্দিন সুস্থতার জন্য এই পেশিগুলো বেশ কয়েকটি অতি প্রয়োজনীয় কাজ করে থাকে। এর প্রধান কাজগুলো নিচে খুব সহজভাবে আলোচনা করা হলো:
১) ভেতরের অঙ্গগুলোকে সুরক্ষিত রাখা: আমাদের শরীরের ভেতরের কিছু অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ রয়েছে; যেমন- মূত্র জমা রাখার থলি, নারীদের ক্ষেত্রে জরায়ু, পুরুষদের ক্ষেত্রে বিশেষ প্রজনন গ্রন্থি এবং মল জমা রাখার থলি। এই তলদেশীয় পেশিগুলো অঙ্গগুলোকে খুব যত্ন করে দোলনার মতো ধরে রাখে। আমরা যখন হাঁটাচলা করি বা ভারী কাজ করি, তখন পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টানে কিংবা পেটের ভেতরে কোনো চাপ তৈরি হলে এই অঙ্গগুলো যেন নিজেদের জায়গা থেকে নিচে নেমে না যায়, সেই সুরক্ষা নিশ্চিত করে এই পেশি।
২) শরীরের ভারসাম্য ও দৃঢ়তা বজায় রাখা: আমাদের শরীরের মাঝখানের অংশ, বিশেষ করে কোমর এবং মেরুদণ্ডকে একদম সোজা ও স্থির রাখতে এই পেশিগুলো দারুণভাবে সাহায্য করে। শরীরের অন্যান্য মূল পেশির সাথে মিলে এটি আমাদের হাঁটাচলা এবং ওঠাবসার সময় শরীরের চমৎকার ভারসাম্য বজায় রাখে।
৩) দাম্পত্য জীবনের সুস্থতা: নারী এবং পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই আনন্দময় ও স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনের জন্য এই পেশিগুলোর সুস্থতা অপরিহার্য। এটি শারীরিক সম্পর্কের সময় উদ্দীপনা তৈরি এবং চরম তৃপ্তি লাভের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৪) মল ও মূত্র নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা: আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে জরুরি কাজগুলোর একটি হলো মল ও মূত্র সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। এই তলদেশীয় পেশিগুলো আমাদের মূত্রনালী এবং মলদ্বারের মুখ ঠিক সময়ে খোলা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শক্ত করে বন্ধ রাখার কাজ করে। ফলে, আমাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা অজান্তেই মল বা প্রস্রাব বেরিয়ে যাওয়ার মতো অস্বস্তিকর বা বিব্রতকর ঘটনা ঘটে না।
নারী ও পুরুষের শারীরিক গঠনের পার্থক্য
যদিও নারী এবং পুরুষের শরীরের বাইরের এবং ভেতরের গঠনে বেশ কিছু স্বাভাবিক পার্থক্য রয়েছে, তবুও এই তলদেশীয় পেশির কাজ করার মূল পদ্ধতি দুজনের ক্ষেত্রেই একেবারে একই রকম। জন্মগতভাবেই নারীদের তলদেশীয় পেশির অংশে তিনটি আলাদা পথ বা খোলার জায়গা থাকে- মূত্র ত্যাগের পথ, সন্তান জন্মের পথ (যোনিপথ) এবং মল ত্যাগের পথ। অন্যদিকে, পুরুষদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই এই পথ থাকে দুটি- মূত্র ত্যাগের পথ এবং মল ত্যাগের পথ।
গঠনগত এই সামান্য পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও, এই পেশিগুলো নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার শরীরেই সমানভাবে কাজ করে। তাই সুস্থ থাকার জন্য সবারই এই পেশির যত্ন নেওয়া সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
